যাত্রা কী
যাত্রা বাংলার এক প্রাচীন লোকনাট্য। চারদিকে দর্শক, মাঝখানে খোলা আসর বা মঞ্চ। জোরালো সংলাপ, গান, বাজনা আর রঙিন পোশাকে অভিনেতারা পালা পরিবেশন করেন।
একসময় গ্রামে যাত্রা মানেই সারারাত জেগে উৎসব। মাদুর, চাদর নিয়ে মানুষ সন্ধে থেকে জায়গা দখল করতেন। পালা শেষ হলে ভোরের আলোয় বাড়ি ফেরা ছিল অনেকের ছোটবেলার স্মৃতি।

উৎপত্তি
“যাত্রা” শব্দটির মানে চলা বা গমন। ধারণা করা হয়, দেবদেবীর উৎসবে শোভাযাত্রার সঙ্গে গান আর অভিনয় থেকে এই শিল্পের জন্ম। রথযাত্রা, দোলযাত্রার মতো উৎসবের নামেও এই শব্দ আছে।
শ্রীচৈতন্যদেবের সময় কৃষ্ণলীলা নিয়ে পালাগান জনপ্রিয় হয়েছিল বলে মনে করা হয়। পরে পৌরাণিক কাহিনির পাশাপাশি ঐতিহাসিক আর সামাজিক পালাও শুরু হয়। রামায়ণ-মহাভারতের গল্প থেকে শুরু করে সমাজের নানা সমস্যা, সবই যাত্রার বিষয় হয়ে উঠেছে।
স্বাধীনতা আন্দোলনে যাত্রা
পরাধীন ভারতে যাত্রা দেশপ্রেম ছড়ানোর মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। চারণকবি মুকুন্দদাস তাঁর স্বদেশি যাত্রার মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে মানুষকে জাগিয়ে তুলেছিলেন বলে তাঁর খ্যাতি। ব্রিটিশ সরকার তাঁর পালা নিয়ে বিরক্ত হয়েছিল।
যেখানে খবরের কাগজ পৌঁছত না, সেখানেও যাত্রার গান পৌঁছে যেত। লেখাপড়া না জানা মানুষও গানের কথা মনে রেখে অন্যকে শোনাতেন। সেই সময়ের দেশপ্রেমিকদের কথা পড়ো কাজী নজরুল ইসলাম রচনায়, যাঁর গানও মানুষকে জাগিয়েছিল।
চিৎপুরের যাত্রাপাড়া
কলকাতার চিৎপুর অঞ্চল যাত্রাশিল্পের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানে বহু যাত্রা সংস্থার অফিস। রাস্তার ধারে বড় বড় রঙিন ছবিতে নতুন পালার বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে।
রথযাত্রার সময় থেকে নতুন মরশুমের বায়না শুরু হয়, গ্রামের পুজো কমিটি আর মেলার আয়োজকেরা এসে পালা ঠিক করেন। পুজো থেকে শীত পর্যন্ত দলগুলো জেলায় জেলায় ঘুরে বেড়ায়। শীতের মেলায় যাত্রার আসর বসার কথা আছে পৌষমেলা ও বাঙালির শীতের উৎসব লেখায়।
যাত্রার বৈশিষ্ট্য
যাত্রায় অভিনয় একটু উঁচু স্বরে আর নাটকীয় ভঙ্গিতে হয়, কারণ খোলা আসরে দূরের দর্শকের কাছেও পৌঁছতে হয়। কনসার্ট বা বাজনা দিয়ে পালা শুরু হয়। হারমোনিয়াম, ঢোল, বাঁশি, ক্ল্যারিনেট মিলে তৈরি হয় সেই আবহ।
“বিবেক” নামে একটি বিশেষ চরিত্র গানের মাধ্যমে কাহিনির নৈতিক দিকটি তুলে ধরে। মঞ্চে পর্দা বা দৃশ্যপট প্রায় থাকে না, অভিনয় আর সংলাপেই দর্শক গল্পের জগতে ঢুকে পড়েন। চার দিক খোলা থাকায় অভিনেতাদের সব দিকের দর্শকের দিকে ঘুরে ঘুরে অভিনয় করতে হয়।

বর্তমান অবস্থা
টেলিভিশন, সিনেমা আর মোবাইলের যুগে যাত্রার দর্শক কমেছে। অনেক শিল্পী আর কলাকুশলী অর্থকষ্টে পড়েছেন। নতুন প্রজন্মের অনেকে কখনও যাত্রার আসরে বসেনি।
তবু গ্রামবাংলায় এখনও যাত্রার আসর বসে। সরকারি যাত্রা উৎসব আর নতুন ধরনের পালা দিয়ে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। অনেক চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অভিনেতাও যাত্রায় অভিনয় করে এই শিল্পে নতুন দর্শক টানছেন।
শেষ কথা
যাত্রা বাংলার নিজস্ব শিল্প। সুযোগ পেলে একবার যাত্রার আসরে বসে পালা দেখে এসো। পুজোর সময় গ্রামবাংলার উৎসব নিয়ে পড়ো দুর্গাপূজা রচনা।
লোকশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার দায় আমাদের সবার। বাংলার আরেক জনপ্রিয় বিনোদনের কথা পড়ো গুপী গাইন বাঘা বাইন পরিচিতিতে, যেখানে গান আর অভিনয় মিলেমিশে গেছে।







