গুপী গাইন বাঘা বাইন: উপেন্দ্রকিশোরের গল্প থেকে সত্যজিতের ছবি

ভূতের রাজার তিন বর, গানের জাদু আর যুদ্ধ থামানোর গল্প। ছোট-বড় সবার প্রিয় এই কাহিনির পরিচয়।
সত্যজিৎ রায়

গল্পের উৎস

“গুপী গাইন বাঘা বাইন”-এর মূল গল্প লিখেছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, যিনি “টুনটুনির বই”-এর লেখক এবং বাংলা শিশুসাহিত্যের পথিকৃৎ। তাঁর নাতি সত্যজিৎ রায় এই গল্প নিয়ে ছবি বানান। ছোটদের পত্রিকা “সন্দেশ”-এর সূচনাও উপেন্দ্রকিশোরের হাতে।

সত্যজিতের বাবা সুকুমার রায়ের কথা তো সবাই জানে, “আবোল তাবোল”-এর স্রষ্টা। তিন প্রজন্মের এই পরিবার বাংলার শিশুসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। ছোটদের জন্য মজার অথচ ভাবনার গল্প বলার ধারাটা যেন এই পরিবারের রক্তে।

জয়সলমের দুর্গ
ছবি: Gerd Eichmann, CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons

কাহিনি

গুপী গান গাইতে ভালোবাসে, তবে তার বেসুরো গানে গ্রামের রাজা বিরক্ত হয়ে তাকে গাধার পিঠে চড়িয়ে গ্রাম থেকে বের করে দেন। জঙ্গলে তার দেখা হয় বাঘার সঙ্গে, যাকে ঢোল বাজানোর জন্য একইভাবে তাড়ানো হয়েছে। দুজনে বন্ধু হয়।

সেখানে তাদের দেখা হয় ভূতের রাজার সঙ্গে। তিনি খুশি হয়ে তিনটি বর দেন: যখন খুশি খাবার আর পোশাক পাওয়া, জাদুর জুতো পায়ে দিয়ে যেখানে খুশি যাওয়া, আর এমন গান-বাজনা যা শুনে মানুষ স্থির হয়ে যায়। বর পাওয়ার জন্য দুজনকে একসঙ্গে হাততালি দিতে হয়, তাই বন্ধুত্বই তাদের আসল শক্তি।

যুদ্ধ থামানোর গান

এরপর গুপী-বাঘা পৌঁছয় শুন্ডি আর হাল্লা রাজ্যে। হাল্লার রাজা দুষ্ট মন্ত্রীর প্রভাবে শুন্ডি আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। শুন্ডির রাজা আর হাল্লার রাজা আসলে দুই ভাই, এই তথ্যটা গল্পে বড় মোচড় আনে।

গুপী-বাঘা তাদের গান আর বুদ্ধি দিয়ে যুদ্ধ থামায়। ক্ষুধার্ত সৈন্যদের সামনে আকাশ থেকে মিষ্টির হাঁড়ি নামার দৃশ্য ছবির সবচেয়ে মনে রাখার মতো মুহূর্তগুলোর একটা। পেটভরা সৈন্যরা আর লড়তে চায় না, এই সহজ দৃশ্যেই গভীর কথা বলা হয়ে যায়।

ছবির বিশেষত্ব

ছবিতে গুপীর ভূমিকায় তপেন চট্টোপাধ্যায় আর বাঘার ভূমিকায় রবি ঘোষ অভিনয় করেছিলেন। গান আর সুর সত্যজিৎ রায়ের নিজের। “মহারাজা তোমারে সেলাম”, “দেখো রে নয়ন মেলে”, “ভূতের রাজা দিলো বর” জাতীয় গানগুলো আজও জনপ্রিয়।

ভূতের নাচের দৃশ্যটি নিয়ে চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞরা আজও আলোচনা করেন। পরে “হীরক রাজার দেশে” ছবিতে গুপী-বাঘাকে আবার দেখা যায়, সেখানে ছড়ার মতো সংলাপে লেখা হয়েছে গোটা ছবি। সত্যজিতের আরেক সৃষ্টি নিয়ে পড়ো ফেলুদা পরিচিতি।

ঢোল আর ঢাক
ছবি: Dinesh Valke from Thane, India, CC BY-SA 2.0, Wikimedia Commons

গল্পের বার্তা

মজার মোড়কে এই গল্প যুদ্ধের অর্থহীনতা আর ক্ষুধার্ত মানুষের কষ্টের কথা বলে। বন্ধুত্ব, গানের শক্তি আর বুদ্ধির জয়, ছোটরা মজা পায়, বড়রা ভাবনার খোরাক পায়। ক্ষমতার লোভ মানুষকে কীভাবে অন্ধ করে, হাল্লার মন্ত্রী তার উদাহরণ।

এই ভাবনার সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে পারো লোভে পাপ পাপে মৃত্যু ভাবসম্প্রসারণ। একসঙ্গে কাজ করার শক্তি নিয়ে আছে দশে মিলি করি কাজ। গুপী আর বাঘা একা থাকলে কিছুই পারত না, দুজনে মিলেই তারা অসম্ভবকে সম্ভব করেছে।

শেষ কথা

বাড়ির ছোটদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে এই ছবি দেখার অভিজ্ঞতা আলাদা। ছবি দেখার পর গল্পটা নিয়ে ছোটদের সঙ্গে কথা বললে তারাও নিজের মতো করে ভাবতে শেখে। মোবাইলের একা দেখার বদলে পরিবারের সঙ্গে দেখা ছবির স্মৃতি অনেক দিন থাকে।

সত্যজিৎ রায় নিয়ে আরও পড়ো সত্যজিৎ রায় রচনা। গানের প্রতি ভালোবাসা থাকলে দেখো রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিচিতি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts
Scroll to Top